Top News

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ভুলে অর্থনীতির মূল্য দিতে হচ্ছে

বাংলাদেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জের পেছনে রয়েছে একাধিক নীতিগত ভুল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ও মন্তব্যগুলো বাজারে আস্থাহীনতা তৈরি করছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে ডলার ও আমানত সংকটের বিষয়ে কিছু বক্তব্য এবং পদক্ষেপ দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে আরও নড়বড়ে করে তুলেছে।


🎙️ বিভ্রান্তিকর বার্তা ও তার প্রভাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি জানিয়েছেন, ব্যাংকগুলোতে পুলিশ বা কেন্দ্রীয় কর্মকর্তারা গিয়ে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ করবে না। এমন বক্তব্য বাজারে একধরনের শিথিলতার বার্তা দিতে পারে, যা সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারে অসাধু ব্যবসায়ীরা।

আট মাস আগেও গভর্নরের আরেকটি মন্তব্যে আতঙ্ক ছড়ায় ব্যাংকিং খাতে—তিনি বলেন, অন্তত ১০টি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার পথে। এ ঘোষণায় আমানতকারীরা আতঙ্কে পড়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিতে শুরু করেন। এতে দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও গভীর সংকটে পড়ে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিকবার টাকা ছাপিয়ে সহযোগিতা করলেও অনেকে এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।


💸 রিজার্ভ সংকট ও ডলারের দামের উত্তালতা

২০২২ সালের নভেম্বরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। এখন তা কমে ২৫.৬৪ বিলিয়নে ঠেকেছে। একই সময়ে ডলারের দাম ৯৬ টাকা থেকে বেড়ে ১২৩ টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করা, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ থেকে লাগাতার ডলার বিক্রি—এসব পরীক্ষানিরীক্ষা মুদ্রাবাজারকে স্থিতিশীল করার চেয়ে অস্থিতিশীল করেছে বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আইএমএফের শর্ত মেনে বাজারে বিনিময় হার ছেড়ে দেওয়ার ফলেও দামের বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তকে অনেকে সময়োপযোগীও মনে করছেন।


🧠 বাজারভিত্তিক বিনিময় হার: সুফল না কুফল?

১৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারভিত্তিক ডলার রেট চালু করার ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে আন্তঃব্যাংক ও খোলাবাজারে দাম কিছুটা বাড়লেও বড় ধরণের অস্থিরতা দেখা যায়নি। তবে রিজার্ভ না বাড়লে এবং আমদানি আবার বাড়তে থাকলে আগামী প্রান্তিকে সংকট ঘনীভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিআইবিএম-এর অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব বলেন, “বাংলাদেশে ‘ম্যানেজড ফ্লোটিং’ চালু আছে। বাজারে ঘাটতি হলে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি এবং অতিরিক্ত হলে কিনে নেওয়া হবে। তবে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে হলে রিজার্ভ শক্তিশালী করতেই হবে।”


🧾 আমদানি–রপ্তানি ভারসাম্য না থাকলে ঝুঁকি বাড়বে

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি জরুরি। রিজার্ভ কম থাকলে হঠাৎ করে বড় আমদানি চাপ তৈরি হলে বিপর্যয় ঘটতে পারে। জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, “পাঁচশ মিলিয়ন ডলার কোনো বড় ঝড় সামলানোর জন্য যথেষ্ট নয়। রিজার্ভ বাড়িয়ে ৫-৬ বিলিয়নে নিতে হবে। একইসাথে, রেমিট্যান্স যেন হুন্ডির পরিবর্তে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসে—তা নিশ্চিত করা জরুরি।”


🧮 দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কোথায়?

ড. এম মাসরুর রিয়াজ, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান বলেন, “বিনিময় হার দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে আটকে রাখার কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এখন বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ, যদিও বিলম্বিত।”
তিনি আরো বলেন, “নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই বাজারের মনস্তত্ত্ব ও সময়োপযোগিতা বিবেচনায় নিতে হবে।”


✅ ভুল নীতি ও বার্তার খেসারত যেন না দিতে হয় বারবার

দেশের আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে দরকার দায়িত্বশীল ও বাস্তবভিত্তিক নীতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মন্তব্য এবং পদক্ষেপ বাজারে কী বার্তা দিচ্ছে—তা বোঝা জরুরি। একইসাথে, রিজার্ভ বৃদ্ধি, বিনিয়োগে গতি আনা এবং আমদানি–রপ্তানি ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি।

Post a Comment

Previous Post Next Post